শুক্রবার (১৮ অক্টোবর) মার্কিন গণমাধ্যম দ্য ভয়েসের মতামত বিভাগে এ আহ্বান জানান তিনি।
এ সুইস সাংবাদিক বলেন, আমি সবসময় বাংলাদেশকে ভালোবাসি। ২০০৪ সালে আমি প্রথমবার বাংলাদেশে যাওয়ার পর থেকেই। সেই সময়ে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ইংরেজি সংবাদপত্র ডেইলি স্টারে ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করতাম। আমি আগে কখনও সেখানে যাইনি। আমি যেখান থেকে গিয়েছিলাম তার থেকে সবকিছুই আলাদা ছিল। পছন্দ করতাম রাস্তার কোলাহল, খাবারের গন্ধ, রাত নামলে রাস্তার ধারে আগুন, পরিশ্রমী মানুষ, দিন এবং রাতের প্রশংসা করতাম। তাদের দয়া, তাদের হাসি, যখন আমি ঢাকার রাস্তায় হারিয়ে গিয়েছিলাম তারা আমাকে সাহায্য করেছিল। আমি কখনই ভুলিনি।
বাংলাদেশের প্রেমে পড়েছিলাম বলেই গত ২০ বছরে বারবার ফিরে যেতাম। রানা প্লাজার বিপর্যয়ের সময় আমি সেখানে ছিলাম। আমার দেশে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছি। নিয়মিত আমার সাংবাদিক বন্ধুদের সাথে দেখা করতে, উষ্ণ আতিথেয়তা নিতে, সবুজ মাঠ এবং ঘূর্ণায়মান পাহাড়ে ডুব দিতে এবং সুন্দরবনের প্রান্তর আবিষ্কার করতে গিয়েছি সেখানে। বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া দেখেছি।
একবার বাংলাদেশ ঘুরে এসে আমি ঢাকার সৌন্দর্য নিয়ে এই লেখাটি লিখেছিলাম- যদি কেউ দেখে আসার চেষ্টা করে। এত বছর ধরে আমি বাংলাদেশের সত্যিকারের বন্ধু হওয়ার চেষ্টা করেছি। সেজন্যই এটা আমার কাছে ভালো খবর ছিল। আগস্টের শুরুতে যখন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসকে বেছে নেওয়া হয়েছিল।
মুহাম্মদ ইউনূসকে তার দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে আজীবন লড়াইয়ের জন্য প্রশংসা করি। আমার কর্মজীবনে তার দুবার সাক্ষাতকার নিয়েছিলাম। যখন তিনি দেশে সমালোচিত হন তখন বিশ্বে আমার লেখা তার প্রতিবাদ করেছিল, পক্ষে ছিল। কিন্তু তারপরেও আমার রক্ত হিম হয়ে যায় যখন আমি জানতে পারি, মুহাম্মদ ইউনূসের নিয়োগের পরপরই ডজন খানেক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। আমার প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুদের কয়েকজনকে এমনকি কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছে বেআইনিভাবে হত্যার অভিযোগে। অন্যায়ভাবে তাদের বলা হয় ‘ফ্যাসিবাদী’।
গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের সবসময়ই শক্ত পথ ধরে হাঁটতে হয়েছে। কারণ সবসময়ই এক দিক থেকে বিপদ ছিল। কিন্তু শক্ত পথে হাঁটা সাংবাদিকদের ‘ফ্যাসিস্ট’ এ পরিণত করে না এবং এটি কখনই তাদের কারাগারে নিক্ষেপ করা এবং তাদের ‘খুনী’ বলা সমর্থন করে না। যেমনটি আমার বন্ধু ফারজানা রুপা এবং শাকিল আহমেদ এবং আরও অনেকের সাথে হয়েছে।
দুর্ভাগ্যবশত, ইতিহাসে সাংবাদিকরা সবসময়ই ভালো বলির পাঁঠা হয়েছে। বিক্ষোভে নিহত ছাত্রদের হত্যার দায় পুলিশকে না দিয়ে নিরীহ সাংবাদিকদের ওপর চাপানো অনেক সহজ। মুক্ত গণমাধ্যম যে কোনো প্রকৃত গণতন্ত্রের স্তম্ভ।
আজ অবধি, ১০০টিরও বেশি সাংবাদিককে জুলাইয়ের শুরু থেকে আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডের জন্য হত্যার প্ররোচণা দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। যদিও বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।
আমি নিজেকে প্রশ্ন করি, বাংলাদেশের সংবিধান কি সেই কাগজে লেখা মূল্যবান নয়? আর এটা কিভাবে সম্ভব যে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে এসব কর্মকাণ্ড ঘটছে? কেন একজন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষা করেন না, বাকস্বাধীনতা রক্ষা করেন, আমার সাংবাদিক বন্ধুদের রক্ষা করেন না?
আমিও বিভ্রান্ত যে শিক্ষার্থীরা পরিবর্তন এনেছিল তারা কি একটি পৃষ্ঠাও উল্টানোর প্রতিশ্রুতি দেয়নি? যদি তাই হয় তাহলে কেনও তারা তাদের পূর্বের শাসকদের মতো একই ভুল করছেন। সাংবাদিকদেরকে বলির পাঁঠা হিসেবে ব্যবহার করছেন। এমন কর্মকাণ্ডের জন্য তাদের কিছুই করার নেই? তাদের ভয়ভীতি দেখানো, মারধর করা, কারাগারে রাখা?
বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে একটি নতুন অধ্যায় খুলতে চায়, একটি আধুনিক গণতন্ত্র হিসেবে স্বীকৃতি পেতে চায়, তাহলে দেশটিকে এক নীতিতে কাজ করতে হবে। যার অর্থ, মৌলিক মানবাধিকার রক্ষা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষা, বাক স্বাধীনতার নিশ্চয়তা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশের প্রত্যেক নাগরিককে নিরাপদবোধ করা। শুধু যারা এখন ক্ষমতায় আছে তারা নয়।
যেহেতু আমি এখনও বাংলাদেশকে বিশ্বাস করি, এখনও ভালবাসতে চাই। যেমনটি আমি এত বছর ধরে করেছি। আমি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সমস্ত মামলা প্রত্যাহার এবং সাংবাদিক হওয়া ছাড়া অন্য কারণব্যতীত কারাবন্দিদের মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানাই। সাংবাদিকদের সুরক্ষা প্রয়োজন যাতে তারা আবার নিরাপদে কাজ করতে পারে। কারণ মুক্ত গণমাধ্যম যে কোনও প্রকৃত গণতন্ত্রের স্তম্ভ। তাই সাংবাদিকদের গণতন্ত্রের চতুর্থ শক্তি বলা হয়। বাংলাদেশ যদি এই চতুর্থ শক্তিকে ভয় পায় এবং সাংবাদিকদের জেলে নিক্ষেপ করে শুধুমাত্র সাংবাদিক বলেই, সেটা গণতন্ত্র নয় এবং কখনোই হবে না।
বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে প্রমাণ করতে হবে যে তারা সত্যিই ইতিহাসের একটি পাতা পাল্টাতে যাচ্ছে। এটি সফল হলে, খ্যাতি এবং সম্মান অর্জন করবে। তারপরে বিশ্বজুড়ে এনজিও এবং সরকার থেকে বিনিয়োগ আসবে।
লেখক: শার্লট জ্যাকমার্ট
সিনিয়র এডিটর, সুইস পাবলিক রেডিও, সুইজারল্যান্ড।














