আকাশে কিছু তারা ওঠে কেবল আলো ছড়াতে নয়, গোটা আকাশকে নিজের রঙে রাঙিয়ে দিতে। বাংলা চলচ্চিত্রের রূপালী আকাশে তেমনই এক মোহনীয় ধূমকেতু হয়ে এসেছিলেন শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন যাঁকে এক নামে সবাই চেনে ‘সালমান শাহ’। ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের মাটিতে জন্ম নেওয়া এই তরুণ যখন নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এসে দাঁড়ালেন ক্যামেরার সামনে, তখন ঢাকাই চলচ্চিত্রের চেনা ব্যাকরণ এক নিমেষে ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল। মাত্র চার বছরের ক্যারিয়ার, ২৭টি চলচ্চিত্র অথচ সেই সংক্ষিপ্ত সময়ে তিনি যে ইতিহাস রচনা করেছিলেন, তা আজও ঢাকাই চলচ্চিত্রের সোনালী অধ্যায় হিসেবে উজ্জ্বল।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে দেশীয় সিনেমা যখন একঘেয়ে গল্প আর চেনা ফর্মুলার গোলকধাঁধায় বন্দি, ঠিক তখনই ১৯৯৩ সালে সোহানুর রহমান সোহানের ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ দিয়ে রূপালী পর্দায় আবির্ভাব ঘটে এক মায়াবী যুবরাজের। প্রথম ছবির প্রথম দৃশ্যেই সেই মায়াবী চাহনি, অমায়িক হাসি আর সহজাত অভিব্যক্তি দিয়ে পুরো দেশকে বুঁদ করে রেখেছিলেন তিনি। মৌসুমীর সঙ্গে শুরু হওয়া সেই সাফল্যের জোয়ার শাবনূরের সঙ্গে এসে রূপ নিয়েছিল বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা জুটিতে। ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘বিক্ষোভ’, ‘দেনমোহর’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ কিংবা ‘সত্যের মৃত্যু নেই’ প্রতিটি ছবিই প্রেক্ষাগৃহমুখী করেছিল দেশের শিক্ষিত ও তরুণ মধ্যবিত্ত সমাজকে। সালমান পর্দায় আসা মানেই ছিল তখন ভালোবাসার এক নতুন সংজ্ঞায় ভাসতে শুরু করা।
তবে সালমান শাহ শুধু একজন নিখুঁত অভিনেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম আধুনিক স্টাইল আইকন। সময়ের চেয়ে অন্তত বিশ বছর এগিয়ে থাকা এই তরুণের ফ্যাশন সচেতনতা আজও নতুন প্রজন্মকে বিস্মিত করে। মাথায় বাঁধা রঙিন ব্যান্ডানা, কপালে চুইয়ে পড়া ঝলমলে চুল, ঢিলেঢালা শার্ট, লেদার জ্যাকেট কিংবা কানে একটি ছোট্ট দুল সবকিছুতেই তিনি তৈরি করেছিলেন একান্ত নিজস্ব এক ভাষা। তখনকার কলেজপড়ুয়া তরুণেরা সেলুনে গিয়ে বলত, ‘সালমান শাহ কাট চুল দিন।’ পোশাকের কাটিং থেকে হাঁটার স্টাইল, তরুণ প্রজন্ম তখন শুধু সালমান শাহকেই অনুসরণ করেনি, রীতিমতো ধারণ করেছিল। আজ ২০২৩-২৪ বা তারও পরের আধুনিক ফ্যাশনের দিকে তাকালে অবাক হয়ে দেখতে হয়, সালমান শাহ নব্বইয়ের দশকেই সেই স্টাইল কতটা সাবলীলভাবে বয়ে নিয়ে বেড়িয়েছিলেন।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৫ বছর বয়সে এই নক্ষত্রের অকালপ্রয়াণ ঢাকাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ভারী শোকের কালো চাদর বিছিয়ে দিয়েছিল। যে বয়সে মানুষের জীবন শুরু হয়, ঠিক সেই বয়সেই তিনি বিদায় নিলেন এক বুক রহস্য আর একরাশ অপূর্ণতা রেখে। তবে মৃত্যু তাঁর পার্থিব দেহকে কেড়ে নিলেও রূপালী পর্দার সেই স্বপ্নিল রাজপুত্রকে কেড়ে নিতে পারেনি একটুও। আজ এত বছর পরেও কোনো নতুন নায়ককে ভালোবাসার অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলতে গেলে সালমানের মায়াবী হাসির কাছেই ফিরে আসতে হয়। জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করি আমাদের সেই অমর নায়ককে; কারণ ক্ষণজন্মা নক্ষত্ররা হয়তো দ্রুত নিভে যায়, কিন্তু রেখে যায় এমন এক আলো যা যুগ যুগ ধরে পথ দেখায়।


.webp)











