দক্ষিণ এশিয়ার ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশ ফাতেমা রানী মা মারিয়ার তীর্থোৎসব ঘিরে এখানে তৈরি হয়েছে এক অনন্য আধ্যাত্মিক আবহ।
ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের কাছে ফাতেমা রানী বা মা মারিয়ার তীর্থোৎসব অত্যন্ত পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ। প্রতিবছর এই আয়োজনের মাধ্যমে পুণ্যার্থীরা তাঁদের আত্মশুদ্ধি, পাপমোচন এবং সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য লাভের আকুতি জানান। এবারের তীর্থোৎসবের মূল সুর নির্ধারিত হয়েছে মানবতার জননী ফাতেমা রানী মা মারিয়া। বর্তমান অস্থির ও সংকটে ভরা বিশ্বে শান্তি, সৌহার্দ্য, পারস্পরিক সহমর্মিতা এবং মানবতার বার্তা ছড়িয়ে দিতেই এই প্রতিপাদ্যের গভীর তাৎপর্য রয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিশ্বাসীদের বিশ্বাস, মা মারিয়ার মধ্যস্থতায় প্রার্থনা করলে মনের বাসনা পূর্ণ হয় এবং জীবনে শান্তি নেমে আসে। তাই ধর্ম-বর্ণের সীমানা পেরিয়ে এই তীর্থক্ষেত্র এক মিলনমেলায় পরিণত হয়, যেখানে মানুষ সব গ্লানি ও অহংকার ভুলে মানবতার ছায়াতলে একত্রিত হন।
১৯৪২ সালে প্রায় ৪২ একর জমির ওপর এই সাধু লিওর ধর্মপল্লী প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে পর্তুগালের বিখ্যাত ফাতেমা নগরীর আদলে ও অনুকরণে এই স্থানটিকে বার্ষিক তীর্থক্ষেত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে প্রতিবছর অক্টোবর মাসের শেষ দুই দিন এই তীর্থোৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। পাহাড়ি ভূমিতে ৪৮ ফুট উঁচুতে স্থাপিত মা মারিয়ার মূর্তির পাদদেশে পুণ্যার্থীরা মাথা নত করে প্রার্থনা জানান। সময়ের পরিক্রমায় এটি কেবল একটি স্থানীয় প্রার্থনা সভা নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় আত্মিক মিলনায়তনে রূপ নিয়েছে।
দুই দিনব্যাপী এই তীর্থোৎসবে রয়েছে বেশ কিছু আবেগঘন ও ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠান। প্রথম দিন পাপস্বীকার ও পবিত্র খ্রিস্টযাগের মাধ্যমে উৎসবের আধ্যাত্মিক আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। তবে এই উৎসবের সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর ও আকর্ষণীয় অধ্যায় হলো সন্ধ্যার আলোক শোভাযাত্রা। হাজার হাজার পুণ্যার্থী হাতে মোমবাতি জ্বালিয়ে, নিস্তব্ধ পাহাড়ি পথে প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেন। মোমবাতির আলোয় আলোকিত পাহাড়ি পথ যেন পাপ থেকে মুক্তি ও আলোর পথে যাত্রার প্রতীক হয়ে ওঠে।
রাতের নিশিজাগরণ, সাক্রামেন্টের আরাধনা এবং পরের দিন সকালে পরিবেশিত জীবন্ত ক্রুশের পথ নাটিকা উপস্থিত পুণ্যার্থীদের চোখে জল আনে। যিশু খ্রিস্টের আত্মত্যাগের সেই দৃশ্য পুণ্যার্থীদের মনে ত্যাগের মহিমা ও বিশ্বাসের গভীরতা জাগিয়ে তোলে। সবশেষে মহা খ্রিস্টযাগের মধ্য দিয়ে এই দুই দিনের তীর্থযাত্রার সমাপ্তি ঘটে।
এই তীর্থোৎসব শুধু ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি রূপ নেয় সর্বজনীন উৎসবে। মিশনের পাশের মাঠে আদিবাসী গারো সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প, পোশাক এবং নানান পণ্যের দুদিনের এক জমজমাট মেলা বসে। পাহাড়ি জনপদের এই মেলা ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মিলন ঘটাতে সাহায্য করে। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা এবং স্বেচ্ছাসেবকদের তৎপরতায় প্রতিবছর শান্তিপূর্ণভাবে এই উৎসব সম্পন্ন হয়।
গারো পাহাড়ের বুক চিরে চলা ফাতেমা রানীর এই তীর্থোৎসব কেবল প্রার্থনা বা মানত পূরণের স্থান নয়; এটি মানবপ্রেম, ক্ষমা, শান্তি ও আত্মশুদ্ধির এক অনুপম পাঠশালা। পুণ্যার্থীরা তাঁদের মনের সব গ্লানি ও ক্লান্তি ধুয়েমুছে এই পাহাড়ি পাদদেশ থেকে নতুন প্রত্যয় নিয়ে ফিরে যান নিজ নিজ কর্মস্থলে।
বার্তা নিউজ/এমএনকে














