বুধবার (৪ নভেম্বর) হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটকের সামনের গাছগুলোর নিচে বিছানা পেতে শুয়ে-বসে আছেন কয়েকজন অভিভাবক। তাদের পাশে অসুস্থ শিশু। কারও শিশুর হাতে চলছে স্যালাইন, কেউ অপেক্ষা করছেন চিকিৎসা কিংবা ওষুধের জন্য। হাসপাতালের ভেতরে জায়গা না পেয়ে বাধ্য হয়ে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন তারা।
হাসপাতালের শিশু বিভাগের সিনিয়র স্টাফ নার্স তাজনেহার বলেন, শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া রোগীদের অধিকাংশই শ্বাসকষ্ট, জ্বর, সর্দি-কাশি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত।
পঞ্চগড়ের বিউটি বেগম তার ১৭ মাস বয়সী নাতিকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন। শিশুটি জন্ম থেকেই বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছে। এবার টাইফয়েড ও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে। বিউটি বেগম বলেন, ওয়ার্ডের ভেতরে প্রচণ্ড গরম ও ভিড়। একটি বিছানায় দুই থেকে তিনটি শিশুকে রাখা হচ্ছে। শিশুরা কান্নাকাটি করে, ভেতরে থাকতে চায় না। তাই বেশির ভাগ সময় নাতিকে বাইরে খোলা বাতাসে রাখতে হয়। স্যালাইন ও ইনজেকশন দেওয়ার সময় শুধু ভেতরে নেওয়া হয়।
হাসপাতালের পরিবেশ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তার অভিযোগ, রোগীর তুলনায় শৌচাগার কম। নারী-পুরুষকে একই শৌচাগার ব্যবহার করতে হচ্ছে। খাওয়ার পানিরও সংকট রয়েছে। রাস্তার পাশের টিউবওয়েল থেকে পানি আনতে গেলেও অনেক সময় সেটি ব্যবহার করা যায় না। তখন হোটেল থেকে পানি আনতে হয়।
পঞ্চগড়ের জগদল সর্দারপাড়ার হোসেন আলী তার অসুস্থ শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তিনি বলেন, একটি বিছানায় দুই থেকে তিনজন রোগী রাখা হচ্ছে। ভেতরে শোয়ার তো দূরের কথা, বসার জায়গাও পাওয়া যায় না। প্রচণ্ড গরম ও ভিড়ে শিশুরা থাকতে চায় না।
বালিয়াডাঙ্গীর বড়পলাশবাড়ীর আবু বকর বলেন, তার শিশু জ্বরের কারণে দুই দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। কিন্তু হাসপাতাল থেকে কোনো ওষুধ পাননি। প্রয়োজনীয় সব ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে। ওয়ার্ডে ফ্যান থাকলেও প্রচণ্ড গরমে শিশুটি কান্নাকাটি করে।
একই অভিযোগ করেন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ঢেপটিগুড়া গ্রামের কৃষক শরিফুল্লাহ। তিনি নাতিকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন। তার ভাষ্য, ভর্তি হওয়ার পর থেকে হাসপাতাল থেকে কোনো ওষুধ পাননি। ইতিমধ্যে ৭০০ টাকার ওষুধ বাইরে থেকে কিনেছেন। ব্যবস্থাপত্রে আরও ওষুধ লেখা হয়েছে, সেগুলোও বাইরে থেকে কিনতে হবে।
ভূল্লী উপজেলার লাউথুতী গ্রামের রুমা তার দুই বছর বয়সী ছেলে রুহুল আমিনকে নিয়ে পাঁচ দিন ধরে হাসপাতালে আছেন। শিশুটির ১০ থেকে ১২ দিন ধরে জ্বর। রুমা বলেন, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকে বিনা মূল্যে কোনো ওষুধ পাননি। হাসপাতালে আসার আগে ১ হাজার ৩০০ টাকার ওষুধ কিনেছিলেন। চিকিৎসকেরা সেগুলো বাদ দেওয়ার পর নতুন করে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকার ওষুধ কিনতে হয়েছে।
একই ধরনের অভিযোগ করেন আর্নিতা আক্তার। তাঁর সন্তান জ্বর থেকে টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়েছে। চার-পাঁচ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। তিনি বলেন, পাঁচ দিনে প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকার বেশি ওষুধ কিনতে হয়েছে। হাসপাতালে খাওয়ার পানি পাওয়া যায় না। টিউবওয়েলের হাতল বাঁধা থাকায় পানি তোলার উপায় নেই। শৌচাগারের অবস্থাও নাজুক। দুটি শৌচাগারের একটিতে ময়লা জমে বন্ধ রয়েছে, অন্যটি সবাইকে ব্যবহার করতে হচ্ছে।
মো. নূর হোসেন বলেন, তার শিশু ঠান্ডা ও বুকে কফ জমার সমস্যায় আক্রান্ত। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর কোনো ওষুধ পাননি। বাইরে থেকে নতুন মেডিকেল টেপ কিনে আনার পর সেটি রেখে তাকে প্রায় শেষ হয়ে যাওয়া পুরোনো টেপ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিশুর বাবা বলেন, তার ১৫ মাস বয়সী মেয়েকে ২ নভেম্বর দিবাগত রাত একটার দিকে হাসপাতালে ভর্তি করেন। ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী দুটি ক্যানুলা কিনে আনলেও একটি শিশুর শরীরে পরানোর পর অন্যটি ও নতুন টেপ নিজেদের কাছে রেখে দেওয়া হয় বলে তার অভিযোগ। পরে টেপ চাইলে নেই বলে জানানো হয়। ইনজেকশনসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রীও বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। শৌচাগার ও গোসলখানার পরিবেশও অত্যন্ত নোংরা বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মোহাম্মদ মিলনের অভিযোগ, স্যালাইন সেট, ক্যানুলা, টেপ ও সিরিঞ্জসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী রোগীদের নিজেদের টাকায় কিনতে হচ্ছে। হাসপাতাল থেকে কোনো ওষুধ বা সামগ্রী দেওয়া হচ্ছে না।
শিশু ওয়ার্ডের পাশাপাশি হাসপাতালের শৌচাগার ও পানির ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গণপূর্ত বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. কামাল হোসেন বলেন, দুটি শৌচাগারে সমস্যা রয়েছে, বাকি চারটি চালু আছে। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে আগামী এক সপ্তাহ পর্যবেক্ষণ ও ফলোআপ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ফিরোজ জামান জুয়েল বলেন, সমস্যাগুলো সমাধানে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলী ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগকে বিষয়গুলো জানানো হয়েছে। শৌচাগার ও পানির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ না পাওয়া এবং ক্যানুলা নিয়ে অভিভাবকদের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট সুপারভাইজারকে জানানো হবে। ওষুধের বিষয়ে স্টোরকেও ডাকা হবে। পরিচ্ছন্নতার জন্য সুইপারদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হবে।
রোগীর অতিরিক্ত চাপের বিষয়টি স্বীকার করে তত্ত্বাবধায়ক বলেন, ৪৫ শয্যার বিপরীতে কখনো ২৫০ জনের মতো শিশু ভর্তি থাকে। শিশুদের সঙ্গে মা-বাবাও থাকেন। ফলে ওয়ার্ডে মানুষের চাপ আরও বেড়ে যায়।
বার্তা নিউজ/এসডব্লিউএন













