অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মানবতার দর্শন
নজরুল শুধু একজন কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাওয়া এক সাহসী কণ্ঠ। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ধর্মীয় বিভাজনের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন আপসহীন। ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই’—তার এই দর্শন আজও সমান প্রাসঙ্গিক। সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত হিসেবে নিজের সন্তানদের নাম রেখেছিলেন কৃষ্ণ মোহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ। তার লেখায় যেমন কোরআনের বাণী স্থান পেয়েছে, তেমনি উঠে এসেছে শ্যামা, কালী কিংবা কৃষ্ণভক্তির গানও। নজরুলের গান, কবিতা আর প্রবন্ধে প্রতিনিয়ত ধ্বনিত হয়েছে বঞ্চিত মানুষের কথা, নারীর অধিকার, শ্রমজীবী মানুষের কষ্ট এবং শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।
স্বল্প সময়ে বিশাল সৃষ্টি
মাত্র ৪৩ বছরের সাহিত্য জীবনে কবিতা, গান, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ মিলিয়ে বাংলা ভাষাকে তিনি উপহার দিয়েছেন দুই হাজারেরও বেশি গান আর অসংখ্য সাহিত্যকর্ম। ‘বিদ্রোহী’, ‘অগ্নিবীণা’, ‘সাম্যবাদী’, ‘দোলনচাঁপা’—তার প্রতিটি সৃষ্টি যেন সময়কে ছাপিয়ে যাওয়া একেকটি চিরঞ্জীব উচ্চারণ।
কবির এই বহুমুখী প্রতিভা প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের চেয়ারম্যান প্রিয়াংকা গোপ বলেন, ‘এত অল্প সময়ে এতগুলো জায়গায় কী করে বিচরণ করে! এটা আসলে আমার কাছে রহস্য মনে হয়।’
বিশ্বদরবারে নজরুল
নজরুল সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ছড়িয়ে দেয়ার কাজ চলছে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক মো. লতিফুল ইসলাম শিবলী বলেন, ‘আমাদের এখন লক্ষ্য হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া। এটার জন্য সম্প্রতি আমরা নজরুল সাহিত্যকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছি। যত বেশি বিদেশি ভাষায় অনুবাদ হবে, তত বেশি নজরুল বিশ্বের হয়ে উঠবে। এটার জন্য নজরুল ইনস্টিটিউট এখন কাজ করছে।’
প্রাসঙ্গিকতা ও চিরস্থায়ী ঠিকানা
নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরে রিজভী জানিয়েছেন, ‘জাতীয় ও সামাজিক জীবনে নজরুল সব সময় প্রাসঙ্গিক’। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ও নজরুল এক অবিভাজ্য সত্তা।’
মানুষে মানুষে বিভেদের দেয়াল ভাঙার স্বপ্ন দেখেছিলেন বলেই কবি মৃত্যুর পরও মানুষের কাছেই থাকতে চেয়েছিলেন। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশেই তাকে সমাহিত করা হয়। যেখানে প্রতিদিন ধর্ম-বর্ণ ভুলে মানুষ এসে তার কবরে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিবেদন করে।
কাজী নজরুল ইসলাম শুধু সাহিত্যিক ছিলেন না, ছিলেন সম্প্রীতির এক জীবন্ত প্রতীক। তাই শুধু স্মৃতিতে নয়, বরং প্রতিনিয়ত নজরুল চর্চার মাধ্যমেই তার আদর্শকে ধারণ করা প্রয়োজন।
বার্তা নিউজ/পিআরএএন














